লেবুর সমস্ত স্বাস্থ্য উপকারিতা ও অপকারিতা

(লেবুর উপকারিতা ও অপকারিতা)

আমরা প্রাত্যহিক জীবনে সকলেই কম বেশি লেবু খেয়ে থাকি। সাধারণত খাবারের স্বাদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে । আবার অনেকে আছেন যারা এটির আচার তৈরি করেও খেয়ে থাকেন। লেবু ফলটি আকারে ছোট হলেও এর উপকারিতা এবং পুষ্টিগুণ অনেক বেশি।

লেবু মূলত রুটেসি পরিবারের ছোট চিরসবুজ সপুষ্পক উদ্ভিদের একটি প্রজাতি। এটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘সাইট্রাস লিমন’। যদিও লেবু কোথায় উৎপত্তি হয়েছিল সেটা এখনো অজানা, তারপরও লেবু আসামে (উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি অঞ্চল) এবং উত্তর বার্মা বা চীনে প্রথম জন্মেছিল বলে ধারণা করা হয়।

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর পরে, (এটা প্রাচীন রোমের সময়কালে) দক্ষিণ ইতালির মাধ্যমে লেবু ইউরোপে প্রবেশ করে। তবে, তখন সেগুলো ব্যাপকভাবে চাষ করা হত না। পরে পারস্য, তারপরে ইরাক ও মিশরে ৭০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে অল্প অল্প লেবুর প্রচলন দেখা যায়।

তারপরে, পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের দিকে ইউরোপের জেনোভায় সর্বপ্রথম লেবুর পর্যাপ্ত চাষ শুরু হয়। এরপর 1493 সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস হিস্প্যানিওলা তাঁর ভ্রমণকালে লেবুর বীজ নিয়ে আসলে আমেরিকায় প্রথম লেবুর প্রচলন ঘটে।

স্প্যানিশ বিজয় পুরো বিশ্ব জুড়ে লেবুর বীজ ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছিল। লেবুর রসে ২.২ পিএইচ এর মধ্যে প্রায় ৫% থেকে ৬% সাইট্রিক অ্যাসিড থাকে, যার কারণে এটি টক স্বাদযুক্ত হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, লেবু অনেক আগে থেকেই ঔষুধ রুপে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। লেবুতে অনেক ভিটামিন এবং পুষ্টিগুণ রয়েছে। যা শরীরের অনেক রোগ প্রতিরোধ করতে এবং স্থূলত্ব কমাতে দারুন সহায়তা করে।

মজার ব্যাপার হলো, ভারতীয় মহিলারা কাপড়ের দাগ দূর করতেও লেবু ব্যবহার করে থাকেন। এছাড়াও লেবুর আরও অন্যান্য অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে।

চলুন তাহলে আরো বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি-

লেবুর উপকারিতা ও অপকারিতা

লেবুর স্বাস্থ্য উপকারিতা

লেবুর স্বাস্থ্য উপকারিতা অনেক, যা লিখে শেষ করা যাবে না। বর্তমান বিশ্বে ক্যান্সার একটি ভয়াবহ বা মরণব্যাধি হিসেবে পরিচিত। আর লেবুতে রয়েছে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান, যা এই ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, লেবুতে থাকা ভিটামিন ‘সি’ ক্যান্সারের ক্ষতিকর কোষ ধ্বংস করে, ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। সম্প্রতি আরো একটি গবেষণায় জানা যায়, লেবু সব ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধে অনেক কার্যকরী।

যারা বিভিন্ন পেটের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য লেবু আদর্শ ঔষধ রূপে কাজ করে। পেটের সমস্যার মধ্যে রয়েছে ডায়রিয়া, বদহজম, কোষ্টকাঠিন্য ইত্যাদি। এক গ্লাস লেবু পানি আপনাকে এই যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দিতে পারে।

লেবুর সঙ্গে এক চা চামচ মধু হলে আরো ভাল। এছাড়া, শরীর থেকে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকারক পদার্থ বের করতে সাহায্য করে লেবু। ফলে, ‘ইউরিনেশন’ এর মতো রোগও ভাল হয়। পাশাপাশি, লিভারও ভাল থাকে।

আমাদের মধ্যে যারা যথেষ্ট পরিমাণ পটাশিয়াম খায় না, তারা সহজেই বিভিন্ন রকম হৃদরোগে আক্রন্ত হয়ে পড়ে। আর, লেবুর রসে যথেষ্ট পরিমান পটাশিয়াম বিদ্যমান রয়েছে, যা হাইপার টেনশন কমাতে সাহয্য করে।

আর আমরা জানি, হাইপার টেনশন হৃদরোগের অন্যতম একটি কারণ। এছাড়া, মানসিক চাপে ভুগলে শরীরে ভিটামিন ‘সি’র ঘাটতি দেখা দেয়। লেবুর রস এটা পূরণ করে নিমিষেই।

প্রাকৃতিক পরিষ্কারক হিসাবেও লেবু খুব কার্যকরী।এটি ত্বকের লাবণ্য ধরে রাখতে খুবই কার্যকরী। আবার, মধুর সাথে কিছুটা লেবুর রস মিশিয়ে ব্যবহার করলেও ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। লেবু ত্বকের সংকোচন সৃষ্টিকারী পদার্থ গুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

ত্বকের অতিরিক্ত তেল অপসারণ করে। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দূর করে। এছাড়াও, ত্বকের যেকোনো দাগ, বলিরেখা (বয়সের ছাপ) ও ব্রন প্রতিরোধে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

আবার, লেবুতে যে ভিটামিন সি রয়েছে, এটা ত্বকের কোষের ক্ষয় প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়, এই উপাদানটি শরীরে কোলাজেন তৈরি করে। যেটা মুখের অবাঞ্ছিত দাগ দূর করে ঔজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

লেবুর রস মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, দাঁতের ব্যথা এবং মুখের গন্ধ দুর করে। এছাড়াও দাঁতে প্লাক জমার কারণে যে সমস্ত দাগ পড়ে তাও কমায়। আবার, খাবার খাওয়ার পর লেবু পানি দিয়ে কুরু কচি করলে মুখের ব্যাকটেরিয়া দূর হয়।

গর্ভবতী নারীদের জন্যও লেবু খুব উপকারী। এটা শুধু গর্ভবতী নারীদের শরীরই ভালো রাখে না, বরং গর্ভের শিশুরও অনেক উপকার করে থাকে। লেবুতে উপস্থিত ভিটামিন সি ও পটাশিয়াম শিশুর হাড়, মস্তিষ্ক ও দেহের কোষ গঠনে সহায়তা করে।গর্ভবতী মাকেও গর্ভকালীন বিভিন্ন রোগ বালাই থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে।

যারা হালকা শ্বাসকষ্টে ভুগছেন, তারা নিয়ম করে প্রতিদিন খাবারের আগে এক চামচ লেবুর রস খেতে পারেন। আবার, যারা মাইল্ড অ্যাজমায় ভুগছেন, লেবুর রস তাদের জন্যও ওষুধের বিকল্প হিসেবে কাজ করে।

আমরা জানি, ঘুম মানুষের জীবনে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর নিদ্রাহীনতার অন্যতম একটি বড় কারণ হলো স্ট্রেস। যখন কোন ব্যক্তির মনে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়, তখন ওই ব্যক্তির ঘুম আসা এক প্রকার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আর লেবুতে থাকা ভিটামিন সি স্ট্রেস কমাতে সহায়তা করে। এছাড়াও, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রাত্রে ঘুমাতে যাওয়ার আগে লেবুর রস বা লেবু খাইলে ঘুমের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হয়। কারণ লেবুতে এমন অনেক উপাদান রয়েছে, যেগুলো আপনার ঘুমের হরমোন গুলোকে সক্রিয় করে তোলে।

এছাড়া, একটুকরা লেবু দিয়ে নখ পলিশ করলে নখের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। লেবুর মধ্যে থাকা অ্যাবসরবিক অ্যাসিড যেকোনো ধরনের ক্ষতস্থান দ্রুত শুকাত সাহায্য করে। হাড়, তরুনাস্থি ও টিস্যুর স্বাস্থ্য ভাল রাখে লেবু। যদি মূত্রনালীতে সংক্রমণ ঘটে, তাহলে প্রচুর পরিমাণে লেবুর রস পান করুন। কারণ এটি মূত্রনালীর সংক্রমণ রোধ সাহায্য করবে।

আবার, মুরগির স্যুপের সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে খাইলে শারীরিক দুর্বলতা কমে। ক্যান্সার বা অস্ত্রোপচারের পর এই ভাবে লেবু এবং মুরগির স্যুপ খেলে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব। খেলাধুলার পর লেবুর শরবত খেলে শরীরে ইলেকট্রোলাইটসের ভারসাম্য ঠিক থাকে।

লেবুতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি, ফ্ল্যাভনয়েড, সাইট্রিক অ্যাসিড, এবং সামান্য পরিমাণে পটাশিয়াম ও ভিটামিন বি রয়েছে। লেবুতে থাকা অ্যাসিড খাবারের শর্করার খুব সামান্য পরিমাণ শরীরে ফ্যাট বা সঞ্চিত চর্বিতে পরিণত করে। তাই নিয়মিত লেবুপানি পান করলে আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখাটা সহজ হবে।

এছাড়াও, লেবুর রসে K, Fe, Zn, B₂,B₃,B₅, প্রোটিন, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, মিনারেল, রিবোফ্লোবিন, কার্বোহাইড্রেট, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফসফরাস রয়েছে। আর বিশেষজ্ঞদের মতে, যে কোন ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে সাইট্রিক এসিড ও ভিটামিন সি জাতীয় খাবার গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

পাশাপাশি, এই খাবারগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। এছাড়াও লেবুতে আরো অন্যান্য অনেক উপকারিতা রয়েছে।

লেবুর স্বাস্থ্য উপকারিতা

লেবুর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি লেবুর উপকারিতা অনেক। তারপরও প্রত্যেকটা জিনিসের কম-বেশি কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থাকে। এক্ষেত্রে, লেবুরও কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যেমন: যাদের অ্যাসিডিটির (গ্যাস্টিকের) সমস্যা আছে তাদের অতিরিক্ত লেবু খেলে বুক জ্বালাপোড়া ভাব হতে পারে। এতে পেট ফাঁপা সহ আরো নানান ধরনের সমস্যা ও অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

যারা ওজন কমানোর জন্য খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের কার্বোহাইড্রেট ও অন্যান্য পুষ্টির অভাব দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে বেশি পরিমাণ লেবুপানি বা লেবু খাইলে শরীরে ক্লান্তি আসতে পারে।

লেবুতে কারো কারো অ্যালার্জি হয়ে থাকে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে লেবু খাওয়া শুরু করুন। তা-না হলে সমস্যা আরো বাড়তে পারে। অতিরিক্ত লেবু ও লেবুর শরবত পান করলে পেটের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

লেবুর উপকারিতা

সামারি

লেবুতে ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস, পটাসিয়াম, প্যানটোথেনিক অ্যাসিড, দস্তা, ভিটামিন এ, ভিটামিন বি 6, ভিটামিন ই, ম্যাগনেসিয়াম, ফোলেট, তামা, নিয়াসিন থায়ামিন এবং আরও অনেক প্রোটিন রয়েছে। এই পুষ্টি‌ উপাদানগুলি স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।

তবে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, পরিমিত লেবু খাওয়া স্বাস্থের জন্য ভালো। অতিরিক্ত লেবু স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে।

Leave a Comment