খুব গুরুত্বপূর্ণ ১০টি সবুজ চায়ের উপকারিতা

সবুজ চায়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা বা গ্রিন টির উপকারিতা

চা বলতে সচরাচর সুগন্ধযুক্ত ও স্বাদবিশিষ্ট এক ধরনের উষ্ণ পানীয়কে বোঝায়। যেটা চা পাতা পানিতে ফুটিয়ে বা গরম পানিতে ভিজিয়ে তৈরী করা হয়। আর চা গাছ থেকে এই চা পাতা পাওয়া যায়। চা গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ‘ক্যামেলিয়া সিনেনসিস’

গ্রীকদেবী থিয়ার নামানুসারে এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। চা মৌসুমী অঞ্চলের পার্বত্য ও উচ্চভূমির ফসল। একপ্রকার চিরহরিৎ বৃক্ষের পাতা শুকিয়ে চা প্রস্তুত করা হয়। চীন দেশই চায়ের আদি জন্মভূমি। বর্তমানে এটি বিশ্বের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য পানীয়রূপে গণ্য করা হয়।

প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া অনুসারে চা-কে পাঁচটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছেযেমন – কালো চা বা লাল চা, সবুজ চা, ইষ্টক চা, উলং বা ওলোং চা এবং প্যারাগুয়ে চা। বর্তমানে অনেক রকম চায়ের মধ্যে সবুজ চা মানব দেহের জন্য বিশেষ উপকারী হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে।

তাই, আজ আমরা সবুজ চায়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং পুষ্টিগুণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব। চলুন তাহলে শুরু করা যাক-

গ্রিন টির উপকারিতা

সবুজ চায়ের পুষ্টিগুণ

নীচে সারণীতে 100 গ্রাম সবুজ চায়ে যে পরিমাণ পুষ্টিগুণ পাওয়া যায় তার একটি ছোট বিবরণী প্রদান করা হলো-

  • পুষ্টিপরিমাণ
  • শক্তি – 0.96 ক্যালোরি
  • প্রোটিন – 0.2 গ্রাম
  • ঠামেইন বি1 – 0.007 মিলিগ্রাম
  • রিবোফ্লাভিন বি2 – 0.06 মিলিগ্রাম
  • নিয়াসিন বি3 – 0.03 মিলিগ্রাম
  • ভিটামিন বি 6 – 0.005 মিলিগ্রাম
  • ভিটামিন সি – 0.3 মিলিগ্রাম
  • আয়রন – 0.02 মিলিগ্রাম
  • ম্যাগনেসিয়াম – 0.18 মিলিগ্রাম
  • পটাশিয়াম – 8 মিলিগ্রাম
  • সোডিয়াম – 1 মিলিগ্রাম
  • পানি – 99.9 গ্রাম
  • ক্যাফিন – 12 মিলিগ্রাম

এছাড়াও সবুজ চায়ের মধ্যে আরো অন্যান্য পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। এবার চলুন সবুজ চায়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি-

সবুজ চায়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা

1-স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে

মস্তিষ্ক হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ। যেটা করোটির অভ্যন্তরে অবস্থিত এবং দেহের প্রধান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। বলা হয়ে থাকে, মানবদেহের সবচেয়ে জটিল, রহস্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে ব্রেন বা মস্তিষ্ক।

মানব অস্তিত্বের সবকিছু এই ব্রেন দ্বারা পরিচালিত হয়। আর সবুজ চা এই ব্রেনকে সুস্থ ‌‌রাখতে বা ব্রেনের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের মতে, গ্রিন টি ক্যাফিনে সমৃদ্ধ, আর এই উপাদানটি মস্তিষ্ককোষে সরাসরি উত্তেজক প্রভাব ফেলে।

মানুষের মস্তিষ্কের ওপর ক্যাফিনের প্রভাব সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে বোঝবার জন্য বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন গবেষণা করা হয়েছে এবং তাদের প্রত্যেকটিই ইঙ্গিত করে যে ক্যাফিন মানুষের মস্তিষ্কের একটি বিশেষ রাসায়নিকের (এডিনসিন) কার্যকারিতা বন্ধ করে দেয়। ফলে, কমে যাওয়া এডিনসিনের মাত্রা মস্তিষ্ককোষের কার্যক্ষমতা অনেক বেশি বাড়িয়ে তোলে।

গবেষণায় এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, মাঝারি পরিমাণে ক্যাফিন সেবন শুধুমাত্র আমাদের মস্তিষ্কের উত্তেজক হিসেবেই কাজ করে তা-নয়, স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের সমন্বয় উন্নত করতেও সাহায্য করে।

পাশাপাশি, অ্যালজাইমার’স ও পারকিনসন্স-এর মত নিউরোডিজেননিটিভ রোগ আজকাল অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার। এই রোগ হইলে মানুষের মস্তিষ্ক কোষ মরে যায়। আর মস্তিষ্ককোষ মরে যাওয়ার ফলে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়।

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ চায়ের নির্যাস নিউরোডিজেননিটিভ অসুখ সারাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, গ্রিন টিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের বৈশিষ্ট্য স্নায়ুসুরক্ষায় বেশ কার্যকরী।

2-ওজন কমাতে সবুজ চায়ের উপকারিতা

বর্তমান সময় ওজন বৃদ্ধি যেন একটি কমন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই ওজন কমানোর জন্য মানুষ কঠোর পরিশ্রম সহ বিভিন্ন রকম পদক্ষেপও গ্রহণ করে থাকে। তবে ওজন কমাতে সবুজ চায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে দাবি করেন বিশেষজ্ঞরা।

কারণ, একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এটি এক দিনে ৭০ ক্যালরি পর্যন্ত ফ্যাট বার্ন করতে পারে। এই হিসাব অনুযায়, রেগুলার গ্রিন টি পান করলে এক বছরে ৭ Pound পর্যন্ত ওজন কমানো সম্ভব।

এছাড়াও, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সবুজ চায়ের উপকারিতা বোঝার জন্য বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে একাধিক গবেষণা করা হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই বলেছেন, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে গ্রিন টি সত্যিই অনেক কার্যকরী।

কারণ, সবুজ চা বিপাক ক্রিয়া বৃদ্ধি করে। সবুজ চা বা গ্রিনটির পলিফেনল শরীরের ফ্যাট অক্সিডেশন প্রক্রিয়াকে আরও বেশি কার্যকর করে, খাবার থেকে ক্যালরি তৈরি প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। ফলে দেহে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে না।

আবার, সবুজ চায়ে ক্যাটচীন থাকে। এই উপাদানটি পেটের চর্বি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও, এটাতে আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে, যেগুলো শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমাতে সাহায্য করে।

বিশেষ করে পেটের চর্বি কমাতে সাহায্য করে। তবে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, কার্যকরভাবে শরীরের ওজন কমাতে হলে শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সাথে গ্রিন টির সংযোজন ঘটাতে হবে। কারণ শুধুমাত্র সবুজ চা খেয়েই শরীরের সব ওজন কমানো সম্ভব নয়।

3-হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সবুজ চায়ের উপকারিতা

হৃদরোগ বলতে সাধারনভাবে রক্তবাহী ধমনী, মস্তিষ্ক, হৃৎপিন্ড, শিরা ও বৃক্ক সম্পর্কিত রোগকে বোঝায়। হৃদরোগের অনেক কারণের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও অ্যাথেরোসক্লোরোসিস অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বয়সের সঙ্গে হৃৎপিন্ড ও ধমনীর গঠনগত পরিবর্তনও হৃদরোগের জন্য অনেকাংশে দায়ী।

হৃদরোগের সমস্যা সাধারনত বয়স্কদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। তবে বর্তমান সময় তরুন প্রজন্মকেও আক্রান্ত করছে সমানভাবে। মহিলাদের তুলনাই পুরুষরাই এই (হৃদ রোগ বা হার্ট অ্যাটাক) রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

তবে ভালো লাগার মত বিষয় হলো, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিন টি হার্টের সমস্যার সবচেয়ে প্রচলিত বা কমন কারণগুলি মোকাবিলা করতে সাহায্য করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রি রেডিকেলস (এক ধরণের অক্সিজেন যা দেহের পাকীয় ক্রিয়ার কারণে এবং দূষণ ও চাপের কারণে শরীরে তৈরি হয়) আমাদের শরীরের LDL-এর (কম ঘনত্তের কোলেস্টেরলের) বা বাজে কোলেস্টেরলের সাথে মিশে ক্রমে প্লাক (চর্বির আস্তরণ) তৈরি করে। এই প্লাকের ফলে রক্তনালীগুলি ক্রমশ সরু হতে শুরু করে, যার ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো সমস্যাগুলো বেড়ে যায়।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে গ্রিন টি এইসব ফ্রি র‍্যাডিকালদের খুঁজে বের করে এবং এই অক্সিডেশন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে হার্টের সমস্যার সবচেয়ে প্রচলিত কারণগুলি কমিয়ে দেয়।

এছাড়াও, বিশেষজ্ঞদের মত, গ্রিন টি মানুষের প্রতিটি শিরায় কাজ করে। এর ফলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। তাই কোনো কারণে রক্তচাপে কিছুটা পরিবর্তন হলেও শারীরিক কোনো ধরনের ক্ষতি হয় না। তাছাড়া গ্রিন টি রক্ত জমাট বাঁধতে দেয়া না, ফলে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক অনেক কমে যায়।

4-মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে সবুজ চা

আপনি যদি নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধে ভুগে থাকেন? তাহলে আপনার জন্য সুখবর হল, গ্রিন টিতে থাকা ব্যাকটেরিয়ারোধী বৈশিষ্ট আপনাকে এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাড়ি বা দাঁতের সংক্রমণই নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধের প্রধান কারণ।

আর গ্রিন টিতে ‘ক্যাটেকাইন’ নামক একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, এই উপাদানটি মুখের ভিতরের বিভিন্ন ব্যকটেরিয়া ও ভাইরাস ধ্বংস করতে সাহায্য করে। যেটা গলার ইনফেকশনসহ দাঁতের এবং মাড়ির বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

এছাড়াও এটি ওরাল ব্যাক্টেরিয়া ধ্বংস করে ডেন্টাল ক্যাভিটিস প্রতিরোধ করে। গ্রীন টি মাউথওয়াশ হিসেবে খুব ভালো কাজ করে। এটাতে অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল প্রপার্টিস সহ আরো অন্যান্য উপাদান রয়েছে কিন্তু কোনো এলকোহল নেই।

আবার, সবুজ চা দুর্গন্ধনাশক যেমন: পেঁয়াজ বা রসুনের মত কিছু সালফার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার ফলে মুখে যে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়, সেটা মোকাবিলা করতেও দারুন কার্যকরী। তাই আপনার যদি মুখে দুর্গন্ধ থাকে, তাহলে গ্রিন টি মাউথওয়াশ হিসাবে ব্যবহার করতে পারেন।

5-ত্বকের জন্য বেশ উপকারী

ত্বক হচ্ছ প্রত্যেকটা প্রাণীর বহিরাঙ্গিক একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যেটা নরম আবরণ এবং দেহকে আবৃত করে রাখে। এটি প্রাণিদের ভিতরের অংশগুলোকে সুরক্ষিত রাখেন। এছাড়া, ত্বক হচ্ছে বাহ্যিক সৌন্দর্যের সবথেকে বড় এবং প্রধান অঙ্গ।

অধিকাংশ মানুষই বিশেষ করে মেয়েরা তার ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে টাকা এবং মূল্যবান সময়, দুটোই ব্যয় করে থাকেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো এই যে, অল্প খরচে, অল্প সময়ে ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে গ্রিন টি খুবই কার্যকরী। কারণ বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই চা-কে স্টোর হাউস বলা যেতে পারে।

কারণ, গ্ৰিন টি দেহের ফ্রি রেডিক্যালস কমিয়ে অকাল বার্ধক্য রোধ করে। ফ্রি রেডিক্যালস হল, এক প্রকার সক্রিয় অণু, যেটা কোষকলা ধ্বংস করে শরীরের ক্ষতি সাধন করে।

একই সঙ্গে, এটি মুখের বলিরেখা বা বয়সের ছাপ কমাতেও সাহায্য করে। সবুজ-চা পান করার পাশাপাশি, এটি ফেসমাক্স হিসাবেও ব্যবহার করতে পারেন। কারণ, স্বাস্থ্যবিদদের মতে এটা মুখের মেছতা ও ব্রণের দাগ দূর করতেও বেশ কার্যকরী।

এছাড়াও, এটি চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে। মেডিকেল অনুশীলন কারীদের মতে, গ্রিন টিতে থাকা ক্যাফিন চোখের চারপাশের স্নায়ু সংকুচিত করতে সাহায্য করে। যার ফলে চোখের চারপাশের ফোলাভাব কমে যায়। এছাড়া, এটি ত্বকের ক্যানসার প্রতিরোধ করতেও বেশ কার্যকরী।

6-রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

মানুষের সুস্থতা নিশ্চিত করতে এবং কোন উপায়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়, সেটি নিয়ে বিভিন্ন সময় নানামুখী গবেষণা হয়েছে বিশ্বজুড়ে। চিকিৎসক এবং পুষ্টিবিদদের মতে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী না হলে অল্প অসুস্থতাতেও মানুষ খুব সহজে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রোগের আক্রমণও জোরালো হয়।

আর সবুজ চা ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে ক্যান্সার, সব ধরনের রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। এই চা-য়ের ক্যান্সারের সেল ধ্বংস করার মতো ক্ষমতা রয়েছে। এটাতে ক্যাটেকাইন নামক এক ধরনের উপকারী উপাদান রয়েছে। এই উপাদানটি অ্যান্টি ভাইরাল ও অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল হিসেবে বেশ কার্যকর। বিভিন্ন গবেষণায় এটাও দেখা গেছে, এটা শারীরিক বিভিন্ন রোগ বিস্তারেও বাধা দেয়।

এছাড়া, অটোইমিউন রোগ প্রতিরোধ করতেও সবুজ চায়ের কার্যকারিতা অনেক। অটোইমিউন রোগ হল এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যখন একজন মানুষের রোগ প্রতিরোধকতন্ত্র তার নিজস্ব কোষগুলির বিরুদ্ধেই অ্যান্টিবডি তৈরি করে।

ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে, শরীরের রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে গ্রিন-টি অত্যন্ত কার্যকর। এই প্রবন্ধটি প্রস্তাব করে যে, গ্রিন টিতে এমন কিছু যৌগ রয়েছে যেগুলো একজন মানুষের শরীরের নিয়ন্ত্রক টি কোষের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। ফলে, অটোইমিউন রোগের তীব্রতা খুব সহজেই কমে যায়।

7-ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে

ক্যান্সার বর্তমান বিশ্বে একটি মরণব্যাধি হিসেবে পরিচিত। আর এই ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও সবুজ চায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সবুজ চায়ে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানগুলো ত্বক ও খাদ্যনালীর ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে বেশ কার্যকরী। এছাড়াও স্তন ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার এবং গল ব্লাডার ক্যান্সার দূরীকরণে এটি সাহায্য করে।

আবার, শরীরের বিভিন্ন কোষগুলোতে যেনো ক্যান্সারের ধ্বংসাত্মক জীবাণু প্রবেশ করতে না পারে, এবং কোষগুলোকে যেনো আঘাত করতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখে এটি।

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণার দেখা গেছে, স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধক ওষুধের সাথে গ্রিন টির প্রশাসন ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলিকে মেরে ফেলতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও, শরীরের ভালো কোষগুলোর কোনো ক্ষতি না করে সার্বিকভাবে ক্যান্সারের কোষ গুলোকে নির্মূল করত সাহায্য করে।

8-ডায়াবেটিস রূগিদের জন্য গ্রিন টির উপকারিতা

ডায়াবেটিস হলো মানুষের একটি হরমোনজনিত রোগ। রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ তুলনামূলক বেড়ে গেলে তখন তাকে ডায়াবেটিস বলে। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ চা শরীরের ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা বাড়ায়।

পাশাপাশি, সবুজ চা শরীরের ইনসুলিন হরমোনটিকে রক্ত থেকে আরও বেশি পরিমাণে গ্লুকোজ টেনে নিতে সাহায্য করে। যার ফলে শরীরে থাকা রক্তের শর্করাভাব অনেকটা কমে যায়।

জাপানি জনসংখ্যার ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত গ্রিন টি পান করেছেন, তাদের ডায়বিটিস হওয়ার আশঙ্কা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম। এছাড়া, সবুজ চা রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। খাওয়ার পরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়, যা প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে গ্রিন টি। অন্য আর একটি গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত গ্ৰিন টি পান করলে আপনার ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ৪২% পর্যন্ত কমাতে পারে।

9-ডিপ্রেশন দূর করতে গ্রিন টির উপকারিতা

ডিপ্রেশন একটি মানসিক সমস্যা যেটা ভালো না লাগা, অনাগ্রহীতা, মনোযোগহীনতা, মনের অজানা অশান্তি, আরো অনেক মানসিক বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এক গবেষনায় দেখা গেছে ১০% এর বেশি আমেরিকার মানুষ ডিপ্রেশনের শিকার ।

এছাড়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে বিশ্বে ৩০০ মিলিয়ন এর বেশি মানুষ এই সমস্যার মধ্যে রয়েছে। (পরিসংখান২০১৫)। আর সবুজ চা এই ডিপ্রেশন দূর করতে দারুণ উপকারী।

কারণ, গ্ৰিন টি তে আছে থায়ানিন নামক এক ধরনের অ্যামাইনো এসিড, যা শরীর ও মনকে শিথিল করে এবং মানসিক চাপ কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। নিয়মিত গ্ৰিন টি পান করার মাধ্যমে আপনি সহজেই ডিপেশ্রন বা অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

জাপানের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে দুই কাপের বেশি গ্রিন টি পান করেন তারা মানসিকভাবে অনেক বেশি ফিট থাকে।তাই ডিপ্রেশন দূর করতে এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে আজ থেকেই গ্রিন টি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।

10-সবুজ চায়ের অন্যান্য স্বাস্থ্য উপকারিতা

উপরোক্ত উপকারিতা ছাড়াও সবুজ চায়ের আরো অন্যান্য অনেক উপকারিতা রয়েছে। যেমন: নিয়মিত গ্রিন টি পান করলে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমে যায় এবং উপকারী কোলেস্টেরলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

ফলে শরীর সুস্থ থাকে। আবার বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, গ্ৰিন টি আর্থ্রাইটিসের থেরাপির জন্য ভীষণভাবে কার্যকরী। গ্ৰিন টিতে উপস্থিত পলিফেনল গাঁটের ফুলে যাওয়া ও ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। যা আর্থ্রাইটিস রোগের দুটি প্রধান সমস্যা।

গ্রীন টি রক্ত কণিকার কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। ফলে হৃৎপিন্ড ভালো থাকে এবং উচ্চরক্তচাপের সমস্যা দূর হয়। গ্রিন টি নিয়মিত খেলে হাড় ভালো থাকে এবং বার্ধক্যজনিত হাড় ক্ষয় রোধ হয়।

এছাড়াও, সবুজ চা অটোইমিউন রোগ নিরাময় করতে সাহায্য করে। অটোইমিউন রোগ হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে আমাদের রোগ প্রতিরোধতন্ত্র নিজস্ব কোষগুলোর বিরুদ্ধেই এন্টিবডি তৈরি করে।

গ্ৰিন টিতে এমন কিছু যৌগ আছে যেগুলো “টি সেল” ( একটি বিশেষ ধরণের কোষ যা প্রতিরোধকতন্ত্রকে নিজস্ব কোষগুলোকে আক্রমণ করা থেকে আটকায়) এর সংখ্যা বাড়ায়। যেটা অটোইমিউন রোগের তীব্রতা কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।

সবুজ চায়ের উপকারিতা

সাবধানতা

সবুজ চায়ের অনেক উপকারিতা থাকা শর্তেও কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যেমন: যেকোন ধরনের চা বা গ্রিন টি কোনটাই অতিরিক্ত পান করা স্বাস্থ্যের জন্য ভাল না।

আবার, খাবার খাওয়ার আগে বা পরে গ্রিন টি পান করা ঠিক নয়, কারণ এতে হজমের বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। ঘুমাতে যাওয়ার আগে গ্রিন টি পান করা উচিত নয়, এতে আপনার ঘুম সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে।

আবার, গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের প্রতিদিন 2 কাপের বেশি গ্রিন টি পান করা উচিত নয়। কারণ আমরা আগেই জেনেছি এটাতে ক্যাফিন নামক একটি উপাদান থাকে, এই উপাদানটি শিশুর গর্ভপাত এবং জন্মগত ভুল ত্রুটির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই সবুজ চা পান করার সময় অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

সবুজ চায়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা

সামারি

উপরোক্ত উপকারিতা গুলো ছাড়াও সবুজ চায়ের আরো অনেক অন্যান্য উপকারিতা রয়েছে। গ্রীন টি প্রথমে ছিলো ওষুধ তারপর অত্যাধুনিক পানীয়তে পরিণত হয়েছে। এই চা কেবল পিপাসাই মেটায় না ক্লান্তি দূর করতেও অনেক কার্যকরী।শরীরের ফিটনেস ঠিক রাখতেও গ্রীন টি বেশ কার্যকরী।

এছাড়া, জাপানের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যারা দিনে দুই কাপের বেশি গ্রীন টি পান করেন তারা মানসিকভাবে অনেক বেশি সুস্থ থাকেন।সবুজ চা-য়ে ভিটামিন এ, সি, ই, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের খনিজ উপাদান বিদ্যমান রয়েছে।

যেগুলো আমাদের শরীরে খুবই প্রয়োজন। তাই শরীরকে সুস্থ রাখতে আজ থেকেই নিয়মিত সবুজ চা-খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন।

Leave a Comment